কুয়াকাটা সৈকতে ভেসে আসছে হাজার মৃত জেলিফিশ, মাছ ধরা বন্ধ

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত February 3, 2026, 12:53 PM
কুয়াকাটা সৈকতে ভেসে আসছে হাজার মৃত জেলিফিশ, মাছ ধরা বন্ধ
সংবাদটি শেয়ার করুন....

নিজস্ব প্রতিবেদক, বরিশাল: পটুয়াখালীর কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতে অস্বাভাবিকভাবে ভেসে আসছে হাজার হাজার মৃত জেলিফিশ। গত কয়েকদিন ধরে সৈকতের লেম্বুরবন, মাঝিবাড়ি, গঙ্গামতি ও ঝাউ বাগানসহ বিভিন্ন এলাকায় এসব স্বচ্ছ মৃত জেলিফিশ বালিয়াড়িতে আটকে থাকতে দেখা যাচ্ছে।

কখনো জোয়ারের পানিতে ভেসে আসছে, আবার কখনো বালিতে আটকে নিথর হয়ে পড়ছে এগুলো। এদিকে সৈকতের চেয়েও গভীর সমুদ্রের অবস্থা আরও ভয়াবহ বলে জানা গেছে।

জেলেদের ভাষ্য, মাছ ধরার জালে হাজার হাজার জেলিফিশ আটকে পড়ায় জাল নষ্ট হচ্ছে ও মাছ ধরা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ফলে বাধ্য হয়ে মাছ ধরা বন্ধ রেখেছেন অনেক জেলে। এতে দিন কাটছে চরম লোকসান ও অনিশ্চয়তার মধ্যে।

হোসেন পাড়ার জেলে মো. মাহাতাব আঁকন বলেন, প্রতিদিন সাগরে গেলে জালে মাছের চেয়ে জেলিফিশই বেশি উঠছে। জাল পরিষ্কার করতেই সময় চলে যায়, মাছ ধরা সম্ভব হচ্ছে না। সংসার চালানো নিয়ে খুব দুশ্চিন্তায় আছি।

ঝাউবন এলাকার জেলে মো. শামিম হোসেন জানান, প্রতিবছর মার্চ-এপ্রিলে কিছু জেলিফিশ আসে, কিন্তু এবার দুই সপ্তাহ আগেই সাগর ভরে গেছে। এমন অবস্থা আগে কখনো দেখিনি। এখন সাগরে গেলে শুধু ক্ষতি হচ্ছে।

স্থানীয় জেলেরা জানান, সাধারণত ফেব্রুয়ারি-মার্চে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য জেলিফিশের দেখা মিললেও এ বছর আগেভাগেই এর ব্যাপকতা বেড়েছে। এতে উপকূলের কয়েক হাজার জেলে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।

গবেষকদের মতে, জেলিফিশ সমুদ্রের একটি প্রাকৃতিক প্রাণী ও সামুদ্রিক খাদ্যশৃঙ্খলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। জেলিফিশ মূলত অতিক্ষুদ্র প্ল্যাংকটন খেয়ে বেঁচে থাকে ও নিজে আবার কচ্ছপ, কিছু মাছ ও সামুদ্রিক প্রাণীর খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়। বিশেষ করে সামুদ্রিক কচ্ছপের প্রধান খাবারের একটি হলো জেলিফিশ।

তবে সাগরে কচ্ছপসহ জেলিফিশভোজী প্রাণীর সংখ্যা কমে যাওয়ায় জেলিফিশের বংশবিস্তার নিয়ন্ত্রণে থাকছে না। পাশাপাশি সাগরের পানির তাপমাত্রা বৃদ্ধি, অক্সিজেনের ঘাটতি ও দূষণ জেলিফিশের সংখ্যা দ্রুত বাড়তে সহায়তা করছে। গবেষকরা বলছেন, জেলিফিশের আধিক্য অনেক সময় সমুদ্রের পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার সতর্ক সংকেত হিসেবেও ধরা হয়।

বিষয়টি নজরে এসেছে সমুদ্র অর্থনীতি, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য নিয়ে কাজ করা গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইকোফিশের। প্রতিষ্ঠানটির সহযোগী গবেষক মো. বখতিয়ার হোসেন জানান, তারা মৃত জেলিফিশের নমুনা সংগ্রহ করেছেন ও বিষয়টি নিয়ে গবেষণা চলছে।

উপকূল পরিবেশ রক্ষা আন্দোলনের (উপরা) যুগ্ম-আহ্বায়ক আবুল হোসেন রাজু বলেন, জেলিফিশের আক্রমণের পাশাপাশি বছরের বিভিন্ন সময়ে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বৈরী আবহাওয়া এবং বছরে দুই দফা মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞার কারণে উপকূলীয় জেলেরা এমনিতেই চরম সংকটের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। এর ফলে তাদের জীবন-জীবিকা মারাত্মকভাবে হুমকির মুখে পড়েছে।

বর্তমান এই কঠিন পরিস্থিতিতে উপকূলীয় জেলেরা সরকারের পক্ষ থেকে আরও কার্যকর নজরদারি ও সহায়তা বাড়ানোর জোর দাবি জানাচ্ছেন। একই সঙ্গে আমরা সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর প্রতি বারবার অনুরোধ জানিয়ে আসছি গবেষকদের সম্পৃক্ত করে জেলিফিশসহ সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য নিয়ে গভীর গবেষণা পরিচালনার মাধ্যমে জেলেদের কীভাবে ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করা যায়, সে বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা হোক।

পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োলজি অ্যান্ড জেনেটিক্স, মৎস্য বিজ্ঞান অনুষদের ফিশারিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. রাজিব সরকার বলেন, জেলিফিশ কচ্ছপের প্রধান খাদ্য। কিন্তু সাগরে কচ্ছপের সংখ্যা কমে যাওয়ায় জেলিফিশের বিস্তার স্বাভাবিকভাবে নিয়ন্ত্রণে থাকছে না। পাশাপাশি সাগরের গভীরে অক্সিজেনের ঘাটতি ও পানির তাপমাত্রা বৃদ্ধিও জেলিফিশ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে কাজ করছে।

তিনি আরও বলেন, ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাসে সাগরের স্রোতের গতিপথে পরিবর্তন আসে। এসময় প্রজননের জন্য উপযোগী লবণাক্ততা ও পর্যাপ্ত আলোর সন্ধানে জেলিফিশ উপকূলের দিকে চলে আসে, ফলে জেলেদের জালে ব্যাপকভাবে জেলিফিশ আটকে ক্ষতির পরিমাণ বাড়ে। তাই প্রতি বছর পরিকল্পিতভাবে যদি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সামুদ্রিক কচ্ছপ অবমুক্তকরণ কর্মসূচি পালন করে, তাহলে প্রাকৃতিক খাদ্যচক্র পুনরুদ্ধার হবে ও দীর্ঘমেয়াদে জেলিফিশের আধিক্য কমিয়ে জেলেদের ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করা সম্ভব হবে।

উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা অপু সাহা বলেন, প্রতিবছরই নির্দিষ্ট সময়ে জেলিফিশ তীরে আসে। সাধারণত ১৫ থেকে ২০ দিনের মধ্যেই এই সমস্যা প্রাকৃতিকভাবে কমে যায়।