হিন্দু ভোটের মোহে বিএনপি কি নিজের রাজনৈতিক সর্বনাশ ডেকে আনছে?

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত November 2, 2026, 17:03 PM
হিন্দু ভোটের মোহে বিএনপি কি নিজের রাজনৈতিক সর্বনাশ ডেকে আনছে?
সংবাদটি শেয়ার করুন....

নিজস্ব প্রতিবেদক।
‎যে ভোট পাওয়ার নিশ্চয়তা নেই, তার জন্য নিজের রাজনৈতিক ভিত্তি দুর্বল করছে না তো বিএনপি?
‎
‎বেশ কিছুদিন ধরে একটা খচখচানি কাজ করছে মাথার ভেতর। এমনকি পেটের ভাতও ঠিকমতো হজম হচ্ছে না। কিছু বিষয় কিছুতেই মাথা থেকে যাচ্ছে না। তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন বিএনপি কি হিন্দু ভোটের মোহে নিজের রাজনৈতিক সর্বনাশ ডেকে আনছে?
‎জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে গরুর মাংস খাওয়া নিয়ে বিতর্ক এবং সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে বিএনপির উচ্চপর্যায়ের নেতাদের বিবৃতি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট দেখে আমার মনে হচ্ছে, দলটি হিন্দু সংখ্যালঘু ভোট নিজেদের পক্ষে নিশ্চিত করতে বেশ উঠে পড়ে লেগেছে।
‎সরকারের অবস্থান সব ক্ষেত্রে স্পষ্ট কি না, সেটি আলাদা প্রশ্ন। কিন্তু বিএনপির নেতাদের বক্তব্য ও তৎপরতা দেখে প্রশ্ন জাগছে দলটি কি সত্যিই নতুন ভোটব্যাংক তৈরির চেষ্টা করছে, নাকি যে ভোট পাওয়ার নিশ্চয়তা নেই, তার পেছনে ছুটতে গিয়ে নিজেদের দীর্ঘদিনের সমর্থকদের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করছে?
‎গণতন্ত্র যখন ভোটের হিসাবের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, তখন রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে ভোটই হয়ে ওঠে ক্ষমতায় যাওয়ার প্রধান হাতিয়ার। আদর্শ, মূল্যবোধ কিংবা অন্য কোনো বিবেচনার চেয়ে ভোটের হিসাব প্রাধান্য পেতে শুরু করে। কিন্তু সেই হিসাব মেলাতে গিয়ে যদি নিজের রাজনৈতিক অবস্থান ও সমর্থকদের মনস্তত্ত্ব উপেক্ষা করতে হয়, তাহলে সেটি কৌশল থাকে না; আত্মঘাতী সিদ্ধান্তে পরিণত হয়।আমার প্রশ্ন বিএনপির কাছে “আপনারা কি ভোটের হিসাব করছেন”? নাকি ভোটের হিসাব মেলাতে গিয়ে নিজেদের রাজনৈতিক হিসাবটাই গুলিয়ে ফেলছেন?
‎
‎হিন্দু ভোটের রাজনীতি: বিএনপি কি আওয়ামী লীগের কৌশল বুঝতে পেরেছে?
‎
‎দীর্ঘদিন ধরে হিন্দু সম্প্রদায়ের একটি বড় অংশ আওয়ামী লীগের সমর্থক হিসেবে পরিচিত। বিএনপিও বিভিন্ন সময়ে এই ভোট নিজেদের দিকে আনার চেষ্টা করেছে। কিন্তু সেই চেষ্টা কতটা সফল হয়েছে?এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন। গয়েশ্বর চন্দ্র রায় ও নিপুণ রায়ের মতো নেতাদের এ দেশের জাতীয়তাবাদী হিন্দু-মুসলিমসহ বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ ভালোবাসে ও শ্রদ্ধা করে। তাঁদের গ্রহণযোগ্যতা শুধু ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে নয়; রাজনৈতিক অবস্থান ও ভূমিকার কারণেও তাঁরা মানুষের কাছে পরিচিত।
‎এই উদাহরণ থেকেই বোঝা যায়, একজন হিন্দু নেতা হয়েও জাতীয়তাবাদী রাজনীতিতে গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করা সম্ভব। মানুষের সমর্থন পেতে হলে তাকে শুধু একটি ধর্মীয় সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি হিসেবে বিবেচনা করলে চলে না।
‎অথচ বিএনপির সাম্প্রতিক রাজনৈতিক তৎপরতা দেখে আমার আশঙ্কা হচ্ছে, দলটি হয়তো মনে করছে, কিছু প্রতীকী পদক্ষেপ, কিছু রাজনৈতিক সমঝোতা এবং কিছু নির্দিষ্ট বক্তব্যের মাধ্যমে হিন্দু ভোটের উল্লেখযোগ্য অংশ নিজেদের পক্ষে আনা সম্ভব।
‎যদি বিএনপি সত্যিই এমনটা ভেবে থাকে, তাহলে বলব রাজনীতি এতটা সরল অঙ্ক নয়।
‎আওয়ামী লীগের শাসনামলে সংখ্যালঘু নির্যাতনের নানা অভিযোগ উঠেছে।এবং বিভিন্ন জরিপে  হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা, জমি দখল, বাড়িঘর ও উপাসনালয়ে আক্রমণের মতো ঘটনাও রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। অথচ এসব অভিযোগ ও অভিজ্ঞতার পরও হিন্দু ভোটারদের একটি বড় অংশ কেন আওয়ামী লীগের প্রতি সমর্থন ধরে রেখেছে, সেই প্রশ্নের উত্তর বিএনপিকে খুঁজতে হবে।
‎আমার পর্যবেক্ষণ, বিএনপি যদি এই রাজনৈতিক মনস্তত্ত্ব বুঝতে ব্যর্থ হয়, তাহলে শুধু সংখ্যালঘু ভোটের সমীকরণ মেলাতে গিয়ে দলটি বারবার ভুল সিদ্ধান্ত নেবে।
‎কেন একটি নির্দিষ্ট ভোটারগোষ্ঠীর মধ্যে আওয়ামী লীগের প্রতি দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক আস্থা তৈরি হয়েছে? সেই আস্থার পেছনে ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা, নিরাপত্তার প্রশ্ন, রাজনৈতিক পরিচয়, নাকি অন্য কোনো কারণ কাজ করছে? বিএনপির উচিত এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা।
‎কারণ ভোটারদের রাজনৈতিক মনস্তত্ত্ব না বুঝে শুধু তাঁদের ভোট পাওয়ার চেষ্টা করা রাজনৈতিক দূরদর্শিতার পরিচয় নয়।
‎
‎বাগেরহাটের দুটি আসন: রাজনৈতিক কৌশল, নাকি ভুল হিসাব?
‎
‎বাগেরহাটের দুটি আসনে মতুয়া বহুজন সমাজের প্রতিনিধিদের ধানের শীষের প্রার্থী হিসেবে সামনে আনার রাজনৈতিক সমীকরণটি গুরুত্বপূর্ণ। এর পেছনে হিন্দু ভোট নিজেদের পক্ষে আনার কৌশল কাজ করেছে কি না, সেটি আলোচনার দাবি রাখে।
‎যদি সেই কৌশলের অন্যতম উদ্দেশ্য হয়ে থাকে হিন্দু ভোটের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ নিজেদের পক্ষে আনা,
‎তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে সেই কৌশল কতটা সফল হয়েছে?
‎আমার বক্তব্য হলো, কোনো নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের কাউকে মনোনয়ন দিলেই সেই সম্প্রদায়ের ভোট নিশ্চিত হয়ে যায় না। প্রতিনিধিত্বের প্রতীকী হিসাব আর ভোটের বাস্তব হিসাব এক নয়।
‎একজন হিন্দু নেতাকে প্রার্থী করলেই হিন্দু ভোটাররা ধানের শীষে ভোট দেবেন, এমন নিশ্চয়তা কে দিয়েছে? আবার একজন মুসলিম প্রার্থী হলেই মুসলিম ভোটারদের সমর্থন নিশ্চিত এমন নিশ্চয়তাও নেই।
‎ভোটাররা তাঁদের রাজনৈতিক বিশ্বাস, স্থানীয় স্বার্থ, প্রার্থীর গ্রহণযোগ্যতা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রত্যাশা বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নেন।
‎বিএনপির নেতৃত্বকে বুঝতে হবে, ভোটের রাজনীতিতে ধর্মীয় পরিচয়ের ভূমিকা থাকতে পারে, কিন্তু পরিচয়ই সবকিছু নয়।
‎বাগেরহাটের পরাজয়ে কি টনক নরেছে বিএনপির?
‎
‎যে ভোট পাওয়ার নিশ্চয়তা নেই, তার জন্য নিজের সমর্থকদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরির ঝুঁকি নেওয়া কতটা বুদ্ধিমানের কাজ?
‎
‎বিশটি হিন্দু-অধ্যুষিত গ্রামে ঘুরে আমার যে উপলব্ধি হয়েছে:
‎
‎আমি নিজে অন্তত বিশটি হিন্দু-অধ্যুষিত গ্রামে গিয়েছি। চায়ের দোকানে বসেছি, মানুষের সঙ্গে কথা বলেছি, তাঁদের রাজনৈতিক আলোচনা শুনেছি।
‎আমার মাঠপর্যায়ের পর্যবেক্ষণে, এসব এলাকার মানুষের মধ্যে আওয়ামী লীগ আবার ক্ষমতায় ফিরবে এমন প্রত্যাশা ও উদ্দীপনা এখনো লক্ষ করেছি।
‎এ অভিজ্ঞতা থেকেই আমার মনে প্রশ্ন জেগেছে, বিএনপি ঠিক কোন রাজনৈতিক হিসাবের ওপর দাঁড়িয়ে হিন্দু ভোট নিজেদের পক্ষে আনার পরিকল্পনা করছে?
‎যাঁদের ভোট পাওয়ার আশায় দলটি রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে এত হিসাব করছে, তাঁরা কি সত্যিই বিএনপিকে ভোট দেবেন? নাকি আওয়ামী লীগের প্রতি তাঁদের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক আনুগত্যই শেষ পর্যন্ত প্রাধান্য পাবে?
‎বিএনপির উচিত মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা বুঝে সিদ্ধান্ত নেওয়া। কারণ রাজনৈতিক দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে বসে তৈরি করা হিসাব আর গ্রামের চায়ের দোকানে মানুষের মুখে শোনা রাজনৈতিক হিসাব সব সময় এক হয় না।
‎আমার আশঙ্কা, বিএনপি হয়তো এখনো এই পার্থক্যটি যথাযথভাবে উপলব্ধি করতে পারছে না।
‎
‎
‎:গরুর মাংসের বিতর্কে বিএনপির অবস্থান কোথায়?
‎
‎আওয়ামী লীগের আমলে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্যান্টিনে গরুর মাংস পরিবেশন নিয়ে বিতর্ক ও বিরোধের ঘটনা ঘটেছে। সাম্প্রতিক সময়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, সেটিও বৃহত্তর রাজনৈতিক আলোচনার অংশ।
‎এখানে প্রশ্ন শুধু গরুর মাংস খাওয়া বা না-খাওয়ার নয়। প্রশ্ন হলো, একটি দেশের নাগরিক নিজের খাদ্যাভ্যাস ও ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী জীবনযাপন করতে পারবেন কি না।
‎একজন মুসলমান গরুর মাংস খেতে চাইলে তাঁর অধিকার থাকা উচিত। একজন হিন্দু গরুর মাংস না খেতে চাইলে তাঁর সেই সিদ্ধান্তকেও সম্মান করতে হবে। কিন্তু কারও ব্যক্তিগত ধর্মীয় বিশ্বাস অন্যের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার অধিকার কারও নেই।
‎এই জায়গায় বিএনপির অবস্থান কী?
‎ভারতে গরু খাওয়ার অপরাধের হত্যার ঘটনা হর হামেসা ঘটে সেটা নিয়ে বিএনপির অবস্থান কি?
‎দলটি যদি মনে করে, সংখ্যালঘু ভোট পাওয়ার জন্য এমন সব বিষয়ে নিজেদের অবস্থান অস্পষ্ট রাখতে হবে, তাহলে সেটি দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক বিভ্রান্তি তৈরি করবে।
‎বিএনপি শুধু একটি নির্বাচনী দল নয়; দলটির রয়েছে একটি রাজনৈতিক পরিচয়, জাতীয়তাবাদী আদর্শ এবং ধর্মীয় মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধাশীল সমর্থকগোষ্ঠী। সেই অবস্থান থেকে সরে গিয়ে যদি দলটি মনে করে, সবাইকে খুশি রাখলেই ভোট পাওয়া যাবে, তাহলে তারা ভুল করছে।
‎ধর্মীয় মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার অর্থ অন্য নাগরিকের অধিকার অস্বীকার করা নয়। আবার নাগরিক অধিকারের কথা বলার অর্থ সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিকে অগ্রাহ্য করাও নয়।
‎বিএনপির উচিত এই দুইয়ের মধ্যে সুস্পষ্ট ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করা।
‎কিন্তু দলটি যদি ভোটের হিসাব মেলাতে গিয়ে নিজের রাজনৈতিক অবস্থানই অস্পষ্ট করে ফেলে, তাহলে সেই সিদ্ধান্তের মূল্য দিতে হতে পারে।
‎
‎:ভারতীয় আধিপত্যবিরোধী জনসমর্থন হারানোর ঝুঁকি কি বিএনপি বুঝতে পারছে?
‎
‎বাংলাদেশে ভারতীয় আধিপত্যবিরোধী জনমত একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বাস্তবতা। এই মনোভাবের পেছনে রয়েছে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, সীমান্তে হত্যা, পানিবণ্টন, বাণিজ্যিক সম্পর্কের ভারসাম্য এবং দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্ক নিয়ে মানুষের নানা উদ্বেগ।
‎বিএনপি দীর্ঘদিন ধরে এই জনমতের সমর্থন পেয়েছে। দলটির অনেক সমর্থকের কাছে ভারতীয় আধিপত্যের বিরোধিতা জাতীয়তাবাদী রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
‎কিন্তু বিএনপি যদি এমন কোনো রাজনৈতিক অবস্থান নেয়, যা তার সমর্থকদের কাছে নীতিগত আপস বলে মনে হয়, তাহলে সেই সমর্থনের ওপর প্রভাব পড়তে পারে।
‎আমার আশঙ্কা, এই পরিবর্তনের গভীরতা বিএনপি এখনো উপলব্ধি করতে পারছে না।
‎যে জনমত ভারতীয় আধিপত্যের বিরোধিতার কারণে বিএনপির প্রতি আকৃষ্ট হয়েছে, সেই জনমতের কাছে দলটির অবস্থান যদি অস্পষ্ট হয়ে যায়, তাহলে তার রাজনৈতিক মূল্য দিতে হতে পারে।
‎এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন। ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্কের বিরোধিতা করা আর ভারতীয় আধিপত্যের বিরোধিতা করা এক বিষয় নয়। বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষা করে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখাই হওয়া উচিত রাষ্ট্রীয় নীতি।
‎একইভাবে, হিন্দু সম্প্রদায়ের নাগরিক অধিকার রক্ষা করা আর কোনো রাজনৈতিক দলের ভোটের সমীকরণে তাদের ব্যবহার করা এক বিষয় নয়।
‎বিএনপিকে এই পার্থক্য বুঝতে হবে। নইলে যে জনসমর্থন দলটিকে রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী করেছে, সেই জনসমর্থনই একদিন তার বিরুদ্ধে প্রশ্ন তুলতে পারে।
‎
‎পূর্ণিমার ঘটনা: বিএনপি কি নিজের রাজনৈতিক ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়েছে?
‎
‎উল্লাপাড়ার পূর্ণিমার ঘটনা বাংলাদেশের রাজনীতিতে সংখ্যালঘু নির্যাতনের প্রসঙ্গে আলোচিত একটি ঘটনা। স্থানীয় বিরোধ, হামলার অভিযোগ, রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া এবং পরবর্তী সময়ে তৈরি হওয়া বয়ানসব মিলিয়ে ঘটনাটি রাজনৈতিক আলোচনার অংশ হয়ে উঠেছিল।
‎আমার প্রশ্ন হলো, বিএনপি কি অতীতের এসব ঘটনা থেকে যথেষ্ট রাজনৈতিক শিক্ষা নিয়েছে?
‎কোনো ঘটনা ঘটলে তার নিরপেক্ষ তদন্ত, অপরাধীর বিচার এবং ভুক্তভোগীর পাশে দাঁড়ানো একটি রাজনৈতিক দলের দায়িত্ব। কিন্তু সেই সঙ্গে নিজেদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগেরও যথাযথ জবাব দিতে হয়।
‎বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালে কিংবা ক্ষমতার বাইরে থেকে যেসব অভিযোগের মুখোমুখি হয়েছে, সেগুলো মোকাবিলায় দলটি কতটা কার্যকর ভূমিকা পালন করেছে?
‎আমার দৃষ্টিতে, অতীতের রাজনৈতিক বয়ান মোকাবিলায় বিএনপির আরও কার্যকর ভূমিকা নেওয়ার সুযোগ ছিল।
‎কোনো ঘটনার সত্যতা যাচাই না করে একে সম্পূর্ণ মিথ্যা বলা যেমন ঠিক নয়, তেমনি কোনো ঘটনার রাজনৈতিক ব্যবহার হলে তার প্রতিবাদ করতে তথ্য ও প্রমাণ সামনে আনতে হয়।
‎রাজনীতিতে শুধু অভিযোগের জবাবে অভিযোগ ছুড়ে দিয়ে লাভ হয় না। মানুষের আস্থা অর্জন করতে হয় কাজের মাধ্যমে।
‎বিএনপি যদি অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা না নেয়, তাহলে ভবিষ্যতেও একই ধরনের রাজনৈতিক সংকটে পড়তে পারে।
‎
‎রবীন্দ্রনাথ আছেন, ফররুখ আহমদ ও জসীমউদ্‌দীন কোথায়?
‎
‎সাংস্কৃতিক প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নেও আমার আপত্তি আছে।রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব। বাংলা সাহিত্য ও সংগীতে তাঁর অবদান অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু তাঁকে সম্মান জানাতে গিয়ে ফররুখ আহমদ, জীবনানন্দ দাশ কিংবা জসীমউদ্‌দীনের মতো কবিদের যথাযথভাবে উপস্থাপন করা না হলে প্রশ্ন উঠবেই।
‎রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে দেয়ালচিত্র, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান কিংবা জাতীয় পর্যায়ের আয়োজনে কাদের স্থান দেওয়া হচ্ছে, সেটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ রাষ্ট্রীয় সংস্কৃতি কোনো একক ব্যক্তি বা ধারার সম্পত্তি নয়।
‎রবীন্দ্রনাথকে সম্মান জানানো হবে, তাতে আপত্তি কোথায়? আপত্তি তখনই, যখন অন্য কবি ও সাহিত্যিকদের অবদান যথাযথভাবে উপস্থাপন করা হয় না।
‎যে দেশের সাহিত্যিক ঐতিহ্য এত সমৃদ্ধ, সেখানে সাংস্কৃতিক প্রতিনিধিত্বের ভারসাম্য নিয়ে প্রশ্ন তোলা কি অন্যায়?রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যিক অবদান স্বীকার করেও তাঁর রাজনৈতিক ভূমিকা, বঙ্গভঙ্গবিরোধী অবস্থান এবং সংশ্লিষ্ট ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট নিয়ে আলোচনা করা যায়।কৃষকের খুন চুসে ঠাকুরের জমিদারির মোটা তাজা হওয়া আর পতিতালয়ের ব্যবসা তাকে এলিট রক্তচোশা শ্রেনির প্রতিনিধি বানিয়েছে।  তাঁর সাহিত্যিক মর্যাদার কারণে ঐতিহাসিক প্রশ্নগুলো এড়িয়ে যাওয়ার প্রয়োজন নেই।
‎একইভাবে, ঠাকুরের প্রতিকৃতিতে কালি লাগানো বা ছবি বিকৃত করার ঘটনায় আইনের প্রয়োগ হতে হবে নিরপেক্ষভাবে।তা কখনো রাষ্ট্রদ্রোহ  অপরাধ নয়।রাজনৈতিক বা সাংস্কৃতিক মতভেদের কারণে কাউকে অপরাধী বানানো যাবে না।
‎আমার প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্রের সাংস্কৃতিক উপস্থাপনায় কি সব ধারার কবি ও সাহিত্যিকের যথাযথ মূল্যায়ন হচ্ছে?নাকি কিছু পরিচিত নামকে সামনে আনতে গিয়ে অন্যদের অবদান আড়ালে পড়ে যাচ্ছে?রাষ্টের কর্মকান্ডের মাধ্যমে বোঝা যায় যে রাষ্ট্র কোন পথে আছে
‎
‎:বিচ্ছিন্নতাবাদী বক্তব্যের ক্ষেত্রে একই নীতি কোথায়?
‎
‎চৈতালি রায়,কিংবা গোবিন্দ পরামানিকের যে সব বক্তব্য এখনো ভিডিও আকারে ঘুরছে তা অবশ্যই রাষ্টদ্রোহী অপরাধ। তাদের নামে কেন মামলা হচ্ছে না গ্রেপ্তার হচ্ছে না?তাদের আইনের আওয়াত এনে বিচার করা অতিব জরুরী।
‎কেউ বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব অস্বীকার করছেন কি না, দেশের ভূখণ্ড নিয়ে দাবি তুলছেন কি না কিংবা অন্য কোনো রাষ্ট্রের সঙ্গে রাজনৈতিক সংযুক্তির পক্ষে বক্তব্য দিচ্ছেন কি নাএসব প্রশ্ন গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। আইন লঙ্ঘিত হলে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে।
‎আমার প্রশ্ন রাজনৈতিক দলগুলোর কাছেরাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও নাগরিক অধিকারের প্রশ্নে তাদের অবস্থান কি সবার ক্ষেত্রে সমান?
‎নাকি রাজনৈতিক সুবিধা অনুযায়ী কারও বক্তব্য উপেক্ষা করা হয়, আর কারও বক্তব্য নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখানো হয়?
‎একটি দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হলে একই নীতি সবার ক্ষেত্রে প্রয়োগ করতে হবে। রাজনৈতিক পরিচয়, ধর্মীয় পরিচয় কিংবা সাংস্কৃতিক পরিচয়ের কারণে কাউকে বিশেষ সুবিধা দেওয়া বা কাউকে অযথা হয়রানি করা গ্রহণযোগ্য নয়।বিএনপিকে এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে হবে।
‎
‎জাতীয় সংগীতের প্রশ্নেও কি বিএনপি একই ভুল করছে?
‎
‎জাতীয় সংগীত নিয়ে বিতর্কের প্রশ্নেও বিএনপির রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে আলোচনা হতে পারে।
‎রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রচিত বাংলাদেশের জাতীয় সংগীতের ঐতিহাসিক পটভূমি, সুরের উৎস এবং বঙ্গভঙ্গের সময়কার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নিয়ে প্রশ্ন উঠলে তা তথ্যের ভিত্তিতে আলোচনা করা উচিত।জাতীয় সংগীতের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক নিয়ে বিতর্ক থাকলে সেটিকে কেবল আবেগের প্রশ্ন হিসেবে দেখা ঠিক নয়। আবার কোনো ঐতিহাসিক বিতর্কের কারণে জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে জাতীয় সংগীত বর্জন করবে এমন সিদ্ধান্তও আগেভাগে ধরে নেওয়া যায় না।
‎আমার বক্তব্য হলো, রাষ্ট্রীয় প্রতীক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য নিয়ে আলোচনা করতে হলে ইতিহাস, আইন, সাংবিধানিক প্রক্রিয়া এবং জনগণের মতামত বিবেচনায় নিতে হবে।
‎কিন্তু বিএনপি যদি মনে করে, এমন বিতর্কে নিজেদের অবস্থান অস্পষ্ট রেখে সব পক্ষের সমর্থন ধরে রাখা যাবে, তাহলে দলটি আবারও রাজনৈতিক হিসাবের ভুল করতে পারে।
‎রাজনীতিতে প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর সবার মনমতো হতে পারে না। কিন্তু একটি দলের নিজের অবস্থান স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
‎
‎বিএনপির সামনে সিদ্ধান্তের সময় এখনই:
‎
‎বিএনপিকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, তারা কোন পথে হাঁটবে।কোনো ধর্মীয় সম্প্রদায়ের ভোট পাওয়ার জন্য নয়, বরং দেশের সব নাগরিকের কল্যাণ নিশ্চিত করার জন্য রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে। হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান সবাই বাংলাদেশের নাগরিক। সবার সমান অধিকার, নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।কিন্তু নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করা আর ভোটের জন্য রাজনৈতিক অবস্থান বদলে ফেলা এক বিষয় নয়।
‎বিএনপি যদি মনে করে, কিছু প্রতীকী পদক্ষেপের মাধ্যমে হিন্দু ভোটের একটি বড় অংশ নিজেদের পক্ষে আনা সম্ভব, তাহলে দলটিকে সেই ধারণার বাস্তবতা যাচাই করতে হবে।
‎আবার নিজেদের সমর্থকদের উদ্বেগকে অগ্রাহ্য করেও রাজনৈতিক ভিত্তি শক্তিশালী করা সম্ভব নয়।একটি রাজনৈতিক দলকে সিদ্ধান্ত নিতে হয় তার আদর্শ, নীতি ও দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য বিবেচনা করে। প্রতিটি সিদ্ধান্তে সবাইকে খুশি করার চেষ্টা করলে শেষ পর্যন্ত নিজের অবস্থানই অস্পষ্ট হয়ে যেতে পারে।
‎বিএনপির কাছে আমার প্রশ্ন আপনারা কি এমন একটি রাজনৈতিক ভিত্তি তৈরি করতে চান, যা নাগরিকদের আস্থা ও সমর্থনের ওপর দাঁড়িয়ে থাকবে? নাকি এমন একটি ভোটের সমীকরণ তৈরি করতে চান, যার সাফল্য নিয়ে নিজেরাই নিশ্চিত নন?
‎
‎আওয়ামী লীগ আবার সুযোগ পেলে বিএনপি কি নিজের ভুল বুঝবে?
‎
‎আমার আশঙ্কা, বিএনপি এখন যে রাজনৈতিক কৌশলকে লাভজনক মনে করছে, ভবিষ্যতে সেটিই তাদের জন্য বড় সমস্যার কারণ হতে পারে।
‎আওয়ামী লীগ যদি আবার রাজনৈতিকভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ পায় এবং ভবিষ্যতে নির্বাচনে অংশগ্রহণের পরিস্থিতি তৈরি হয়, তখন বিএনপি হয়তো বুঝতে পারবে, ভোটের হিসাব করতে গিয়ে কোথায় কোথায় ভুল করেছে।
‎তবে রাজনৈতিক দলগুলোকে ভুল বুঝতে সব সময় নির্বাচনের ফলাফল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয় না। মাঠপর্যায়ের জনমত, সমর্থকদের প্রতিক্রিয়া এবং রাজনৈতিক অবস্থানের পরিবর্তন থেকেই সতর্কসংকেত পাওয়া যায়।
‎বিএনপির উচিত এখনই সেই সংকেতগুলো গুরুত্ব দিয়ে দেখা।আমার বক্তব্য হিন্দু ভোট বিএনপির প্রয়োজন নেই এটা নয়। বাংলাদেশের প্রত্যেক নাগরিকের ভোটই বিএনপির প্রয়োজন। কিন্তু সেই ভোট পাওয়ার জন্য নিজের রাজনৈতিক ভিত্তি দুর্বল করার ঝুঁকি নেওয়া কতটা যুক্তিসংগত, সেটিই আমার প্রশ্ন।
‎কোনো সম্প্রদায়ের ভোট স্থায়ীভাবে কারও দখলে থাকে না। মানুষের সমর্থন অর্জন করতে হয়, ধরে রাখতে হয় এবং সেই সমর্থনের মর্যাদা দিতে হয়।
‎বিএনপিকে বুঝতে হবে, হিন্দু ভোট পাওয়ার চেষ্টা অপরাধ নয়; কিন্তু সেই ভোটের মোহে নিজের রাজনৈতিক আদর্শ, সমর্থকদের মনস্তত্ত্ব ও দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অবস্থানকে উপেক্ষা করা মারাত্মক কৌশলগত ভুল হতে পারে।
‎
‎সমস্যা হিন্দু ভোট নয়; সমস্যা ভোটের জন্য নীতিগত অবস্থান বিসর্জন দেওয়া। সমস্যা সংখ্যালঘুদের প্রতিনিধিত্ব নয়; সমস্যা প্রতিনিধিত্বকে ভোটের নিশ্চয়তা হিসেবে ধরে নেওয়া। সমস্যা ধর্মীয় মূল্যবোধ নয়; সমস্যা হলো নাগরিক অধিকার, রাজনৈতিক আদর্শ ও নির্বাচনী কৌশলের মধ্যে সামঞ্জস্য প্রতিষ্ঠা করতে না পারা।
‎রাজনৈতিক দলগুলোর পতন সব সময় প্রতিপক্ষের আঘাতে হয় না। অনেক সময় নিজেদের ভুল সিদ্ধান্তই তাদের পতনের পথ তৈরি করে দেয়।
‎বিএনপির সামনে এখন দুটি পথ একটি সাময়িক ভোটের হিসাব মেলানোর, অন্যটি দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক ভিত্তি শক্তিশালী করার। দলটি কোন পথ বেছে নেবে, সেই সিদ্ধান্ত তাদেরই। কিন্তু ভুল পথে হাঁটলে তার মূল্যও তাদেরই দিতে হবে।
‎