বরিশাল জেলা সদর হাসপাতাল টেন্ডারের মূলহোতা সিভিল সার্জন ঠিকাদার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত।
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত October 31, 2026, 12:24 PM
সংবাদটি শেয়ার করুন....
বরিশাল প্রতিনিধি:
বরিশাল জেনারেল হাসপাতালের চিকিৎসা সরঞ্জাম ও যন্ত্রপাতি কেনার দরপত্রে তিনটি শর্তকে কেন্দ্র করে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। দরদাতাদের অভিযোগ, পূর্বে পণ্য আমদানির প্রমাণ হিসেবে তিনটি আমদানি বিল জমা দেওয়া এবং চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের পাসবই দাখিলের শর্ত রাখা হয়েছে। তাঁদের দাবি, এসব শর্তের যৌক্তিকতা ও বিধিগত ভিত্তি স্পষ্ট করা প্রয়োজন।
এ ছাড়া দরপত্রের পুণ্য পণ্যের তালিকা দেখতে না দেওয়া এবং নির্দিষ্ট ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে শর্ত আরোপের অভিযোগও তুলেছেন কয়েকজন ঠিকাদার। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। সংশ্লিষ্ট দরপত্রের পূর্ণাঙ্গ নথি ও মূল্যায়নপ্রক্রিয়া পরীক্ষা ছাড়া কোনো অনিয়ম বা বিধি লঙ্ঘনের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।
দরপত্রের তিন শর্ত নিয়ে আপত্তি
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বরিশাল জেনারেল হাসপাতালের চিকিৎসা সরঞ্জাম, ওষুধপত্র ও যন্ত্রপাতি কেনার জন্য পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের মাধ্যমে ই-টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে। দরপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিন নির্ধারণ করা হয়েছিল ২৯ অক্টোবর।
দরপত্রের শর্তাবলি নিয়ে সম্ভাব্য দরদাতাদের আপত্তির তিনটি প্রধান বিষয় হলো—
১. দরপত্রে ‘ইমেইলে কিছুই গ্রহণযোগ্য নয়’ মর্মে শর্ত উল্লেখ করা হয়েছে বলে অভিযোগ।
২. দরদাতাকে আগে পণ্য আমদানির অভিজ্ঞতার প্রমাণ হিসেবে তিনটি আমদানি বিল জমা দিতে বলা হয়েছে বলে দাবি করেছেন ঠিকাদাররা।
৩. চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের পাসবই জমা দেওয়ার শর্ত রাখা হয়েছে বলে তাঁদের অভিযোগ।
ঠিকাদারদের প্রশ্ন, চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহের সক্ষমতা, পণ্যের মান, আর্থিক সামর্থ্য ও প্রাসঙ্গিক অভিজ্ঞতা যাচাইয়ের পাশাপাশি এসব শর্ত কেন প্রয়োজন এবং সংশ্লিষ্ট বিধিমালায় এর ভিত্তি কী?
তাঁদের মতে, সরাসরি আমদানির অভিজ্ঞতা না থাকলেও বৈধ আমদানিকারক বা অনুমোদিত সরবরাহব্যবস্থার মাধ্যমে মানসম্মত চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহ করতে সক্ষম প্রতিষ্ঠান থাকতে পারে। তাই কেবল পূর্ববর্তী আমদানি বিলের ভিত্তিতে যোগ্যতা নির্ধারণ করা হলে সম্ভাব্য সরবরাহকারীদের অংশগ্রহণ সীমিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। হসপিটাল কর্তৃপক্ষ এই নিয়ম বেধে দিয়ে নির্দিষ্ট ঠিকাদারকে কাজ দেওয়ার সুস্পষ্ট অভিযোগ রয়েছে তর দাদাদের।
বাজারদরের তালিকা নিয়ে অভিযোগ
দরপত্রের শর্ত নিয়ে আপত্তির পাশাপাশি বাজারদরের মধ্যে পণ্য চাহিদা পত্রতালিকা দেখতে না দেওয়ার অভিযোগও তুলেছেন সাধারণ ঠিকাদাররা।
তাঁদের দাবি, তালিকাটি দেখতে চাইলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে সন্তোষজনক তথ্য পাওয়া যায়নি। এমনকি তালিকাটি গায়েব করে ফেলা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন কেউ কেউ। তবে তালিকাটি সত্যিই গায়েব হয়েছে কি না, নাকি অন্য কোনো কারণে তা দেখানো সম্ভব হয়নি, তা সংশ্লিষ্ট নথি যাচাই ছাড়া নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।
সরকারি অর্থে চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনার ক্ষেত্রে পণ্যের মূল্য নির্ধারণ, বাজারদরের তথ্য, হসপিটালে জিনিসপত্রের চাহিদা পত্র দরপত্র মূল্যায়ন এবং ক্রয়সংক্রান্ত নথির যথাযথ সংরক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণে বাজারদরের তালিকা প্রস্তুত, সংরক্ষণ ও ব্যবহারের প্রক্রিয়া সম্পর্কে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দাবি করেছেন অভিযোগকারী ঠিকাদাররা।
পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ দেওয়ার অভিযোগ হসপিটাল কর্তৃপক্ষ সিভিল সার্জন নির্দিষ্ট ঠিকাদারের সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়ে তাকে একক ভাবে ASH PRESTIGE TRADE, The
Professional
Business
Builders, Master Mind
Incorporation সম্ভাব্য লাইসেন্সের মাধ্যমে কাজ পাইয়ে দেওয়ায় দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ এসব ঠিকাদার বিভিন্ন হাসপাতালে একক ভাবে কাজ পাইয়ে আসছে, বিভিন্ন জেলা সদর হাসপাতালে তদন্ত সাপেক্ষে তাদের নাম উপস্থাপন করতে পারব বলে আশা করি।
দরপত্র মূল্যায়ন ও সংশ্লিষ্ট কমিটির ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা। তাঁদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কমিটির সঙ্গে ডা. আশিক, ডা. রেহেনা ফেরদাউস ও ডা. বলাই কৃষ্ণ বড়াল সংশ্লিষ্ট রয়েছেন।
ঠিকাদারদের অভিযোগ, দরপত্রের শর্ত নির্ধারণ, বাজারদরের বা হসপিটালের চাহিদা পত্র তালিকা প্রদর্শন এবং সম্ভাব্য দরদাতাদের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হচ্ছে না। তাঁদের আশঙ্কা, নির্দিষ্ট একটি পক্ষকে সুবিধা দেওয়ার উদ্দেশ্যে শর্তগুলো নির্ধারণ করা হয়ে থাকতে পারে।
তবে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার উদ্দেশ্যে শর্ত আরোপ করা হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করতে দরপত্র প্রস্তুতের নথি, শর্ত নির্ধারণের যৌক্তিকতা, মূল্যায়নপদ্ধতি এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য যাচাই করা প্রয়োজন।
লিখিত অভিযোগ গ্রহণ না করার দাবি
দরপত্রের শর্ত পুনর্বিবেচনা এবং ক্রয়প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবিতে মেসার্স মর্ডান স্কয়ার এবং Gulf Security
Services (Pvt.)
Ltd নামের কয়েকটি প্রতিষ্ঠান সিভিল সার্জনের কার্যালয়ে লিখিত আবেদন করতে চেয়েছে বলে জানা গেছে।
প্রতিষ্ঠানটির প্রধান সাব্বির হোসেনের দাবি, সরকারি ক্রয়বিধির আলোকে যোগ্য নতুন প্রতিষ্ঠান ও উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণের সুযোগ থাকা প্রয়োজন। কিন্তু বরিশাল জেনারেল হাসপাতালের দরপত্রে আরোপিত কয়েকটি শর্ত সাধারণ ঠিকাদারদের অংশগ্রহণে বাধা সৃষ্টি করছে।
তিনি বলেন, “সরকারি গেজেট ও ক্রয়বিধিমালার আলোকে নতুন প্রতিষ্ঠান ও উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণের সুযোগ থাকার কথা। কিন্তু দরপত্রে এমন কিছু শর্ত দেওয়া হয়েছে, যা সাধারণ ঠিকাদারদের অংশগ্রহণে বাধা সৃষ্টি করছে। আমরা মনে করছি, পছন্দের ব্যক্তিকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যেই এসব শর্ত যুক্ত করা হয়েছে।”
সাব্বির হোসেনের আরও অভিযোগ, এ বিষয়ে সিভিল সার্জনের কাছে লিখিত অভিযোগ দিতে চাইলে তাঁকে অনলাইনে অভিযোগ করার পরামর্শ দেওয়া হয়। লিখিত অভিযোগ গ্রহণে সিভিল সার্জন অনীহা প্রকাশ করেছেন বলেও দাবি করেন তিনি।
সিভিল সার্জনের বক্তব্য
অভিযোগের বিষয়ে বরিশালের সিভিল সার্জন ও বরিশাল জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো. সাইয়েদুর রহমানের বক্তব্য, বিশেষ কাউকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে দরপত্রে কোনো শর্ত আরোপ করা হয়নি। তাঁর দাবি, দরপত্রের শর্তগুলো পাবলিক প্রকিউরমেন্ট BPPA বিধিমালার আওতাভুক্ত।
অন্যদিকে, অভিযোগকারী ঠিকাদারদের দাবি, তাঁরা সংশ্লিষ্ট বিধিমালার গেজেটের কপি দেখিয়ে শর্তগুলোর ভিত্তি জানতে চাইলেও তাঁদের নির্দিষ্ট কোনো বিধি বা ধারা দেখানো হয়নি।
দরপত্রের শর্ত ও অভিযোগ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চাইলে সিভিল সার্জন বলেন, “আমি একটি প্রক্রিয়ার মধ্যে আছি। টেন্ডার প্রক্রিয়া শেষ হলে পুরো বিষয়টি বলতে পারব ওই সময় পর্যন্ত আপনারা অপেক্ষা করেন।
তদন্ত ও স্বচ্ছতার দাবি
অভিযোগকারী ঠিকাদারদের দাবি, দরপত্রের তিনটি শর্তের বিধিগত ভিত্তি প্রকাশ, বাজারদরের তালিকা-সংক্রান্ত অভিযোগের তদন্ত এবং ক্রয়প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি বর্তমান দরপত্র বাতিল করে বিধিসম্মতভাবে নতুন করে দরপত্র আহ্বানের দাবিও জানিয়েছেন তাঁরা।
সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসা সরঞ্জাম ও যন্ত্রপাতি কেনাকাটা সরাসরি জনস্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে সম্পর্কিত। এ ক্ষেত্রে সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার, মানসম্মত পণ্য সংগ্রহ এবং যোগ্য সরবরাহকারীদের মধ্যে কার্যকর প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা জরুরি। তাই অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত, সংশ্লিষ্ট নথি যাচাই এবং কর্তৃপক্ষের সুস্পষ্ট ব্যাখ্যার মাধ্যমে বিতর্কের অবসান হওয়া প্রয়োজন।