পিরোজপুরে বিলুপ্তির পথে মৃৎশিল্প, টিকে থাকার লড়াইয়ে শতাধিক পরিবার

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত April 14, 2026, 18:43 PM
পিরোজপুরে বিলুপ্তির পথে মৃৎশিল্প, টিকে থাকার লড়াইয়ে শতাধিক পরিবার
সংবাদটি শেয়ার করুন....

নিজস্ব প্রতিবেদক, বরিশাল: বাঙালির প্রাণের উৎসব বাংলা নববর্ষ এলেই একসময় ব্যস্ততায় ভরে উঠত পিরোজপুরের মৃৎশিল্প পল্লীগুলো। চৈত্র মাসজুড়ে মাটির খেলনা, সরা, হাঁড়ি-পাতিলসহ নানা তৈজসপত্র তৈরিতে দম ফেলার ফুরসত পেতেন না কারিগররা। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে সেই চিত্র এখন প্রায় অতীত। আধুনিক সামগ্রীর সহজলভ্যতা, প্রযুক্তির উন্নয়ন এবং বাজার সংকটে পিরোজপুরের ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্প আজ বিলুপ্তির পথে।

জেলার কাউখালী উপজেলার সোনাকুড়ে প্রায় দুইশ বছর আগে শতাধিক পরিবার এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত হয়। পরবর্তী কয়েক দশকে তা ছড়িয়ে পড়ে পিরোজপুর সদর, মঠবাড়িয়া ও নাজিরপুর উপজেলায়। এক সময় প্রায় কয়েক হাজার পরিবার এই পেশায় যুক্ত থাকলেও বর্তমানে সেই সংখ্যা নেমে এসেছে শতাধিকের ঘরে।

বিশেষ করে পিরোজপুর সদর উপজেলার পালপাড়া, মুলগ্রাম ও রানীপুর এবং কাউখালীর সোনাকুড়ে এখনো কিছু পরিবার এই পেশা আঁকড়ে ধরে আছে। তবে এক সময়ের জমজমাট মৃৎশিল্প এখন নিভু নিভু প্রদীপের মতো টিকে আছে।

মৃৎশিল্পীরা জানান, পহেলা বৈশাখকে কেন্দ্র করে আগে মাটির তৈরি খেলনার ব্যাপক চাহিদা থাকলেও এখন তা প্রায় নেই বললেই চলে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে দইয়ের হাঁড়ি, সরা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় কিছু তৈজসপত্র তৈরির মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছেন।কারিগরদের অভিযোগ, কাঁচামাল ও শ্রমের মূল্য বৃদ্ধি, আধুনিক প্রযুক্তির অভাব, প্লাস্টিক ও বিকল্প পণ্যের দাপট এবং সহজ শর্তে ঋণ না পাওয়ায় তারা চরম সংকটে পড়েছেন। অনেকেই উচ্চ সুদের ক্ষুদ্র ঋণের ফাঁদে পড়ে পেশা ছেড়ে অন্য কাজে চলে গেছেন। কেউ কেউ দেশ ছাড়তেও বাধ্য হয়েছেন।

সুমন্ত দাস নামে এক মৃৎশিল্পী বলেন, আগে এই কাজ করেই ভালোভাবে সংসার চলত। এখন দিন চলে না। বাধ্য হয়ে অনেকে পেশা বদলেছে। রানি অবন্তী নামে আরেক মৃৎশিল্পী বলেন, আমরা এখানে হাঁড়ি, খাঁড়া, পাড়া, পুতাসহ বিভিন্ন জিনিস মাটি দিয়ে বানাতাম। এখন প্লাস্টিক দিয়ে এসব তৈরি হওয়ায় আমাদের মাটির জিনিসের চাহিদা কমে গেছে। আমরা কোনো রকমে খেয়ে বেঁচে আছি।

পরিবেশবান্ধব এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে সরকারি সহায়তা জরুরি বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। তারা সহজ শর্তে ঋণ, প্রশিক্ষণ এবং পণ্যের বাজার সম্প্রসারণের দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে পিরোজপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মামুনুর রশীদ বলেন, মৃৎশিল্পীদের জন্য সরকারি প্রণোদনা ও বিভিন্ন প্রদর্শনীর আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে।

এক সময় যেখানে পিরোজপুরে আড়াই হাজারের মতো পরিবার এই পেশায় যুক্ত ছিল, সেখানে এখন মাত্র শতাধিক পরিবার টিকে আছে। যথাযথ উদ্যোগ না নিলে শিগগিরই হারিয়ে যেতে পারে শত বছরের এই ঐতিহ্যবাহী পেশা।